স্রষ্টাকে দেখা যায় না কেন? স্রষ্টা অলৌকিক কিছু করেন না কেন যাতে সবাই তাকে বিশ্বাস করে?

knowledge of Islam-রবিবার, মার্চ ০৬, ২০২২ রিয়ালিটি শুধু মাত্র আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমরা যা কিছু পর্যবেক্ষণ করি শুধু মাত্র তার অস্তিত্ব আছে এই ধারণা ভুল। আমরা যা কিছু পর্যবেক্ষণ করি তা ফিজিক্যাল ওয়ার্ল্ডে অস্তিত্বশীল। কিন্তু এর বাহিরে আমাদের মন বা অ্যাবস্ট্রাক্ট ওয়ার্ল্ডেও অনেক কিছুই অস্তিত্বশীল। যেমন আমাদের চিন্তা, ধারণা, প্রকৃতি, শক্তি, মহাকর্ষ বল, আবেগ, রেখা, সংখ্যা, ভালোবাসা, বিশ্বাস, সৃষ্টিকর্তা। রিয়ালিটি বা অস্তিত্ব শুধু মাত্র আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় কারন এমন অনেক কিছুই আছে যেগুলার অস্তিত্ব আছে কিন্তু তা আমরা পঞ্চইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে বুঝতে পারিনা। আমেরিকান নাস্তিক জোতির্বিদ নিল ডিগ্রাসি বলেন , "বর্তমানে মানুষ যদি নিজের ইন্দ্রিয় দিয়ে সমস্তকিছু জাস্টিফাই করে তাহলে তার জন্য বিপদ অপেক্ষা করছে।" [ Neil Degrasse Tyson,Coming to our scenes] আমেরিকার দার্শনিক জর্জ সান্তায়না এই ধরনের বিশ্বাসকে (পঞ্চইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে উপলব্ধি করা যায় না কিন্তু তার অস্তিত্ব আছে এমন জিনিসকে) বলেছেন "অযৌক্তিক বিশ্বাস।" [David Ray Griffin,The Oxford Handbook of religion and science; page 458] বিজ্ঞানের এর দনিয়ায় শুধু যুক্তি ও প্রমাণ ভিত্তিক এবং এখানে বিনা বিচারে কোনো কিছুই গ্রহণ করা হয় না এমন কিন্তু না। বৈজ্ঞানিক মহলে আরও কিছু ধারণা জেঁকে বসে আছে মেলা দিন হলো। বিজ্ঞানী রুপার্ট শেল্ড্রেক স্বীয় গ্রন্থে এমন দশটি বিশ্বাসকে তালিকাবদ্ধ করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে এই প্রতিটি বিশ্বাসেরই ব্যত্যয় ঘটেছে, বিপরীতে প্রমাণ মিলেছে। [Rupert Sheldrake, Science Set Free : 10 Paths to New Discovery; introduction (epub version, New York, Deepak Chopra Books 2012)], ক্যালিফোর্নিয়ার প্রগ্রেসিভ সাইন্স ইন্সটিটিউট-এর পরিচালক, নাস্তিক বিজ্ঞান-দার্শনিক গ্লেন বরচার্ড The Ten Assumptions of Science Towards a New Scientific Worldview গ্রন্থে বিজ্ঞানের দশটি দার্শনিক অনুমানকে লিপিবদ্ধ করেছেন। যথা: ১. Materialism ২. Causality ৩. Uncertainty ৪. Inseparability ৫. Conservation ৬. Complementarity ৭. Irreversibility ৮. Infinity ৯. Relativism ১০. Interconnection যাইহোক মূল বিষয়ে আসি, সাধারণত নাস্তিকরা স্রষ্টাতে বিশ্বাস করেনা। তাদের স্রষ্টা বিশ্বাস না করার অন্যতম একটি আর্গুমেন্ট হচ্ছে - স্রষ্টাকে যেহেতু আমরা সরাসরি দেখতে পাই না, স্রষ্টা যেহেতু Physically exist করেনা সেহেতু স্রষ্টা থাকার সম্ভাবনা নেই, unseen is nothing,যা দেখি না তা বিশ্বাস করি না ইত্যাদি ইত্যাদি। চলুন দেখা যাক নাস্তিকদের এই দাবী কতটুকু যৌক্তিক? আমাদের মধ্যে অনেকে Physical exist বা Empirical evidence এর দোহাই দিয়ে স্রষ্টাকে অস্বীকার করে। আবার, Mathematically Abstract entity বা মৌলিক এনটিটি ধরে নেয়। কিন্তু এগুলা তো আমরা সরাসরি দেখতে পারিনা বা এগুলা physically exist করেনা। সংখ্যা বা রেখা এগুলো Physically exist করেনা বা এগুলার কোনো Empirical evidence ও নেই। কিন্তু সাইন্স কেন এগুলা গ্রহণ করে? স্রষ্টা হচ্ছে Absolute বা পরম, আদি, অনন্ত, অদ্বিতীয়। মহাবিশ্বে কেউ স্রষ্টার Absoluteness বা স্রষ্টার বৈশিষ্টকে অস্বীকার করতে পারেনা। কেউ স্রষ্টার Embodiment হিসেবে God এর যায়গায়, Nature, Nothing,The biggest, The world ইত্যাদি ব্যাবহার করে। কিন্তু The biggest তো অন্য কোনো Biggest থেকে আসতে পারেনা বা Nature তো অন্য কোনো Nature থেকে আসবেনা। যদি অন্য কোনো Nature থেকে আসতো তাহলে Nature তো আর Nature থাকবেনা। সেটা যেখান থেকে এসেছে সেটাই হবে Nature। আবার Nature এর কিন্তু পঞ্চইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে উপস্থিতি উপলব্ধি করা সম্ভব নয়, এর Physical exist পাওয়া অসম্ভব। তাহলে নাস্তিকরাও কিন্তু একটা কিছুকে Absolute, Unlimited, Infinity হিসেবে ধরে নিচ্ছে। সেক্ষেত্রে স্রষ্টার পজিশন কিন্তু ডিফল্ট পজিশন। এই Absolute, Unlimited, Infinity এগুলো তো আমরা অভিজ্ঞতায় পাইনা! এগুলোর তো Empirical কোনো Evidence নেই। তাহলে কেন নাস্তিক’রা একটা কিছুকে Absolute, Unlimited, Infinity, Exist হিসেবে ধরে নেয়? অথচ তারাই কিন্তু Empirical evidence’ এর দোহায় দিয়ে স্রষ্টা’কে অস্বীকার করে। আবার তরাই Empirical evidence ছাড়াই একটা কিছুকে Absolute, Unlimited, Infinity হিসেবে ধরে নিচ্ছে! Mathematically abstract entity বা মৌলিক এনটিটি ধরে নিচ্ছে! আরো একটা উদাহারণ দেওয়া যাক, আমরা যদি ২টি আপেল থেকে ৩টি আপেল বিয়োগ করি তাহলে আন্সার হবে নাই হয়ে একটা আপেল বা -১ আপেল। কিন্তু নাই হয়ে কি কিছু থাকতে পারে? নাই হয়ে ১টা আপেল বা -১ এর ধারণা আমরা কোথায় পায়? এগুলো আমাদের নলেজে দেওয়া থাকে। আমরা যখন বলি একটা আপেল, এখানে ১ মানে আপেল না। ১ হচ্ছে আপেল এর উদাহারণ। পৃথিবী থেকে যদি ১ সংখ্যক সবকিছু তুলে নেওয়া হয় তাহলে কি ১ এর ধারণা কি মুছে যাবে? অবশ্যয় না! তাহলে সংখ্যা, রেখা, শক্তি, প্রকৃতি ইত্যাদি Absolute এর বাস্তবতা কিন্তু ফিজিক্যাল না। সুতরাং, Reality is not always physical. Entity is not always physical. Entity’ এর কিছু অংশ Physical বাকি অংশ Metaphysical. প্রশ্ন হচ্ছে আমরা যদি Abstract entity গুলো মানতে পারি তাহলে স্রষ্টার অস্তিত্ব কেন মানতে পারবোনা? একজন নাস্তিক যদি Physical world এর সাথে Abstract entity মেনে নিতে পারে তাহলে স্রষ্টাকে কেন মানতে পারবেনা? এই ধরণের প্রশ্নে নাস্তিকরাও স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে এই মহাবিশ্বের একজন স্রষ্টা আছে। সুতরাং বলা যায় সকল রিয়েলিটি কিন্তু ফিজিক্যাল না! আমরা শুধু মাত্র Physical exist বা Empirical evidence মেনে নেই না বরং Abstract entity ও মেনে নিচ্ছি। তাহলে কেউ যদি Physical exist বা Empirical evidence এর দোহায় দিয়ে স্রষ্টাকে অস্বীকার করে সেটা হবে তাদের হিপোক্রেসি। এবার আলোচনা করা যাক,স্রষ্টা’কে সরাসরি দেখা সম্ভব কিনা তা নিয়ে। স্রষ্টা হচ্ছে Logical conclusion, Abstract entity, Absolute. আমরা হলাম Particular! Particular কি Absolute বা Abstract entity পর্যবেক্ষণ করতে পারবে? উত্তর হল না, কারন মানুষের পক্ষে যেখানে পঞ্চইন্দ্রিয়ের মধ্যে মহাবিশ্বের অস্তিত্ব প্রমান করা সম্ভব নয়, প্রকৃতি, শক্তি, মহাকর্ষ বল, রেখা, সংখ্যা,ইত্যাদিকে দেখা সম্ভব না সেখানে স্রষ্টার মত সত্তাকে দেখা অসম্ভবই ধরা যায়। আলো কি? আলো হল এক ধরনের শক্তি বা বাহ্যিক কারণ, যা চোখে প্রবেশ করে দর্শনের অনুভূতি জন্মায়। আলো বস্তুকে দৃশ্যমান করে, কিন্তু এটি নিজে অদৃশ্য। আমরা আলোকে দেখতে পাই না, কিন্তু আলোকিত বস্তুকে দেখি। এটি এক ধরনের তরঙ্গ, আলো তির্যক তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গের আকারে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে গমন করে। আবার সব আলোর মাধ্যমে বস্তু আলোকিত হয়ে আমাদেরকে দর্শন দেয় না অর্থাৎ সব ধরনের আলোর মধ্যেমে বস্তু আলোকিত হয়না এবং আমরা তা দেখতে পারি না। দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য হচ্ছে ৩৮০-৭৮০ এবং এর চেয়ে কম বা এর চেয়ে বেশি তরঙ্গ দৈর্ঘ্য মানুষের পক্ষে দেখা সম্ভব না। পৃথিবীতে এর নিচে ও এর উপরের তরঙ্গ দৈর্ঘ্যে আলোতে অনেক পশু পাখি দেখতে পায়। এই সিমানার বাহিরে এক সুবিশাল জগত রয়েছে কিন্তু তা মানুষের পক্ষে দেখা সম্ভব না। শুধু মানুষের দৃষ্টিশক্তিই সীমাবদ্ধ নয়, শ্রবণশক্তিও সীমাবদ্ধ অর্থাৎ মানুষ ২০-২০,০০০ হার্জ এর কম ও বেশি হার্জ এর কোন শব্দই শুনতে পায় না। এখন পর্যন্ত দেখা বিজ্ঞানের আধুনিক বর্ণনা অনুসারে, মহাবিশ্বের ৭২% অন্ধকার শক্তি (Dark Energy), ২৩% অন্ধকার বা গুপ্ত পদার্থ যেটাকে ইংরেজিতে Dark Matter বলে, এবং ৫% ব্যারিয়ন (Baryonic Matter) দ্বারা গঠিত। সুতরাং আমরা মহাবিশ্বের ৪/৫% জানতে পারব। অর্থাৎ মহাবিশ্বের ৯৫% অংশকে পরিক্ষা করার মতো উপকরণ বিজ্ঞানের কাছে নেই। মহাবিশ্বের যে ৪/৫ ভাগ বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণ করতে পারবে তার মাত্র ১% অংশও অধিবিদ্যা (Metaphysics) জানতে পারেনি। তাহলে আমাদের পক্ষে যেখানে মহাবিশ্বের ১০০% এর ৫% জানা সম্ভব! এবং সেই ৫% থেকে আমরা ১% ও জানতে পারিনাই, এত সিমাবদ্ধ জ্ঞান, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি দিয়ে স্রষ্টাকে দেখতে চাওয়া পাগলামি বৈ আর কিছুই না! পদার্থ বিজ্ঞানীদের ধারনা আমাদের অনেকগুলা ডাইমেনশন থাকার সম্ভবনা রয়েছে। অথচ, কেওই তা নিশ্চিতভাবে কোনদিনও দেখতে ও পর্যবেক্ষন করতে পারেনি। যে যাইহোক আশ্চর্য জনক বিষয় হলো হায়ার ডাইমেনশনের জীব আমাদের ডাইমেনশনে ইজিলি পরিবর্তন করতে পারবে। আমরা তাদের দেখতেও পারবো না আবার অনুভবও করতে পারবো না। এমনকি কল্পনাও করতে পারবো না কিভাবে কী হলো। সামান্য হায়ার ডাইমেন্সনের জীবকে মানুষ যদি দেখতে না পারে তাহলে স্রষ্টাকে দেখাত ভাই অসম্ভবেরও অসম্ভব ছাড়া কিছুই না। চিন্তা করেন যে স্রষ্টা এই ডাইমেনসন গুলো তৈরি করেছেন তিনি কতটা পাওয়ারফুল। এমন একজন অবশ্যই কোন সন্দেহ ছাড়া সব কিছুর ঊর্ধে থাকবেন। বিজ্ঞানে শুধু ডাইমেনসনের বিষয়টাই না, এমন অনেক কিছু আছে যেগুলাকে নাকি মানুষের পক্ষে অবজার্ব করা সম্ভব না। আমাদের এই কথাকথিত বিজ্ঞানমনষ্ক নাস্তিকদের জন্য এই বিষয়গুলা খুবই স্বাভাবিক কারন তাদের দেবতা বিজ্ঞান যে বলেছে। এই কান্ডজ্ঞানহীন মানুষকে যদি বলা হয় স্রষ্টাকে দেখা যায় না তখনই তাদের তলানিতে চুলকানি বেড়ে যায়। অথচ সেই স্রষ্টার সৃষ্টি করা জিনিসকে বিজ্ঞান যখন বলে মানুষের পক্ষে দেখা, অনুভব করা, শুনা বা অবজার্ব করা, সম্ভব না তখন তাদের চেতনায় সমস্যা হয় না বা কমন সেন্স এ তা বাধা দেয় না, তাদের সমস্যা হয় শুধু স্রষ্টাকে দেখা যায় না সে বিষয়টাতেই। সমস্ত আলোচনায় এটাত স্পষ্ট যে আমাদের দৃষ্টিশক্তি সিমাবদ্ধ, এই সিমানার বাহিরে আমরা কিছুই দেখতে পাই না। তাইত আল্লাহ বলেছেন - দৃষ্টিশক্তি তাকে আয়ত্ত করতে পারে না। কিন্তু তিনি দৃষ্টিকে আয়ত্ত করে নেন’’ (সূরা আনআম আয়াত ১০৩) এখন প্রশ্ন আস্তে পারে যে স্রষ্টাত স্রষ্টাই, তিনি সব কিছু করতে পারেন. তাহলেত তিনি চাইলে মানুষও উনাকে দেখা সম্ভব, তাহলে তিনি কেন মানুষের সাথে দেখা করে প্রমান করেন না যে তিনি আছেন? এটাইত পরিক্ষা যে আল্লাহকে না দেখেই তার উপর ইমান আনার ও তার দেখানো পথে চলার। আর আমরা তোমাদেরকে অবশ্যই পরিক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা। [সূরা বাকারাহ আয়াত ১৫৫] নিশ্চয় যমীনের উপর যা রয়েছে, তা আমি শোভনীয় করেছি তার জন্য, যাতে তাদেরকে পরীক্ষা করি যে, কর্মে তাদের মধ্যে কে উত্তম। [সূরা কাহফ আয়াত ৭] আমরা তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিলিত শুক্রবিন্দু থেকে, আমরা তাকে পরীক্ষা করব, তাই আমরা তাকে করেছি শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন। নিশ্চয় আমরা তাকে পথ নির্দেশ দিয়েছি, হয় সে কৃতজ্ঞ হবে, না হয় সে অকৃতজ্ঞ হবে। [সূরা আদ-দাহর‌, আয়াত ২-৩], যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য-কে তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে উত্তম? [সূরা মুলক আয়াত ২] মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদের ছেড়ে দেয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না? আর আমি তো তাদের পূর্ববর্তীদের পরীক্ষা করেছি। ফলে আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন, কারা সত্য বলে এবং অবশ্যই তিনি জেনে নেবেন, কারা মিথ্যাবাদী। [সূরা আল-আনকাবূত আয়াত ২-৩] যারা অদৃশ্যে বিশ্বাস করে, যথাযথভাবে নামায পড়ে ও তাদেরকে যা দান করেছি তা হতে ব্যয় করে। এবং তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে ও তোমার পূর্বে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তাতে যারা বিশ্বাস করে ও পরলোকে যারা নিশ্চিত বিশ্বাসী। তারাই তাদের প্রতিপালকের নির্দেশিত পথে রয়েছে এবং তারাই সফলকাম। [সূরা বাকারা আয়াত ৩-৫] আল্লাহ যদি পৃথিবীতে আসেন ও সবাইকে দেখা দেন তাহলেত দুনিয়ার সবাই ভালো কাজ করবে, সবাই তাকে বিশ্বাস করবে, সবাই এক ঈশ্বরকে মানবে, সবাই আল্লাহর আদেশ মত চলবে, কেউ খারাপ কাজ করবে না। মোট কথা প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র উভয় ফাঁস। এমন হলেত আর সেটা পরিক্ষা থাকবে না। উত্তর পত্র ফাঁস হলেও যেমন অনেককে ফেল করে ঠিক তেমনই আল্লাহকে দেখলেও অনেকে তার উপর ইমান নাও আনতে পারে। এছাড়া কোরআনে এই প্রশ্নের উত্তরে কি বলা হয়েছে সেটাও দেখে নিতে পারেন, “আর যারা জানে না, তারা বলে, ‘কেন আল্লাহ আমাদের সাথে কথা বলেন না কিংবা আমাদের কাছে কোন নিদর্শন আসে না’? এভাবেই, যারা তাদের পূর্বে ছিল তারা তাদের কথার মত কথা বলেছে। তাদের অন্তরসমূহ একই রকম হয়ে গিয়েছে। আমি তো আয়াতসমূহ সুস্পষ্ট করে দিয়েছি এমন কওমের জন্য, যারা দৃঢ় বিশ্বাস রাখে।” (সূরা বাকারা আয়াত ১১৮ ও সূরা বানী-ইসরাঈলের ৯০-৯৩নং আয়াতে এবং অন্যান্য স্থানেও অনুরূপ কথা বর্ণিত হয়েছে) যত নবী-রাসূল এসেছেন দুনিয়ায় প্রায় সবার সময়ই কোন না কোন নিদর্শন আল্লাহ দিয়েছেন। এখন অনেকে স্রষ্টা থাকার নিদর্শন চায় অনেকে স্রষ্টাকে দেখতে চায়, আগে কি কোন মানুষ চায় নি এমনটা? যারা সেই নিদর্শন দেখে নি তারা কি দেখতে চাইবে না পরবর্তিতে? তাহলে আল্লাহ কি সব সময় নিদর্শনই বা নিজে দেখা দিতে থাকবে? আল্লাহ কি মানুষের কাছে এতটাই মূল্যহীন নাকি? দুনিয়াতে সাড়ে ৭শত কোটির উপরে মানুষ আছে, এর মধ্যে নাস্তিকদের সংখ্যা বেশি হলে ৭০/৮০ কোটি হবে। মহাবিশ্বের তুলনায় বালু কণার চেয়েও ছোট পৃথিবীর এই ৭০/৮০ কোটি নাস্তিকদের জন্য ইউনিভার্স এর সবচেয়ে মর্যাদাবান সত্তা আল্লাহ নিজে সবার সাথে দেখা করে নিজের অস্তিত্ব প্রমান করবেন এটা চিন্তা করাটাও জ্ঞানহীনতা ছাড়া কিছু না। মানুষের কাছে একটা পিপড়া বা মশার জীবনের মুল্য যতটুকু আল্লাহর কাছে এই নাস্তিকগুলোর মূল্য তারচেয়েও হাজার গুণ কম। এছাড়া আপনারা নাস্তিকরা এমন কোন VIP হয়ে যান নি যে আপনাদেরকে বিশ্বাস করানোর জন্য আল্লাহর আপনার সাথে কথা বলতে হবে। আপনি ফেরারি গাড়ির শোরুমে গিয়ে যদি বলেন, আমি এই গাড়ি কিনবো না যতক্ষণ পর্যন্ত না ফেরারি কোম্পানির CEO আমার সাথে দেখা না করে বা আমার সাথে ফোনে কথা না বলে- তাহলে কি সে আপনার সাথে দেখা করবে? বা আপনার সাথে কথা বলবে? নিশ্চয়ই না। যেখানে সে-ই আপনার সাথে বলবে না, আর সবকিছুর স্রষ্টা, মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ্ তাঁর অস্তিত্ব বিশ্বাস করানোর জন্য আপনার সাথে কথা বলবে? How funny! কোম্পানির আপনার মত দু-একজন মাথা মোটা কাস্টমার না হলেও চলবে। কারণ ভাল জিনিসের কাস্টমারের অভাব হবে না। বরং মাঝখানে আপনি একটা ভাল গাড়ির মালিক হওয়া থেকে বঞ্চিত হলেন! তেমন স্রষ্টায় বিশ্বাস না করলে সেটাতে স্রষ্টার লস নেই বরং লস আপনারই। অনেকে আবার বলে যে আচ্ছা এখন আর আল্লাহকে দেখা সম্ভব না তা মেনে নিলাম, কিন্তু তিনিত স্রষ্টা তাহলে উনি তখন কেন নিজেই নিজের ধর্ম প্রচার করলেন না? নবী রাসূল বা মানুষকেই কেন বার বার প্রেরণ করলেন? এর প্রসঙ্গত বলা ফেরারি গাড়ির উদাহরণ দিয়েছি। তারপরও আরো একটা উদাহর দিই, বাংলাদেশের সবচেয়ে নামকরা কিছু কোম্পানির মধ্যে বসুন্ধরাগ্রুপ সেরা, আবার মেঘনা গ্রুপও সেরা! আচ্ছা আপনি কি কোনদিন দেখেছেন এই কোম্পানির মালিককে তাদের কোম্পানির এড নিজে এসে প্রচার করতে? তাদের কোম্পানির প্রচারের জন্য যদি আলাদা এটিটিউট ওয়ালা লোক নিযুক্ত থাকলে পারে তাহলে স্রষ্টা তার পরিচয় নবী রাসূলদের দিয়ে মানুষের কাছে প্রচার করায় অপরাধ কি? পৃথিবীর সাধারণ একজন ধনী বা সম্মানীত মানুষ যদি এতটা এটিটিউট নিয়ে চলাফেরা করে তাহলে সেখানে সবসৃষ্টির স্রষ্টা আল্লাহ নিজে এসে সবাইকে দেখা দেওয়া বা নিজে ধর্ম প্রচার করার চিন্তাটাও বোকামি ছাড়া কিছুই নয়। আল্লাহ কোরআনে বলেছেন, “কোন মানুষের এ মর্যাদা নেই যে, আল্লাহ তার সাথে সরাসরি কথা বলবেন, ওহীর মাধ্যম, পর্দার আড়াল অথবা কোন দূত পাঠানো ছাড়া। তারপর আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে তিনি যা চান তাই ওহী প্রেরণ করেন। তিনি তো মহীয়ান, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা- শুরা আয়াত ৫১] আমাদের এত ক্ষমতা এবং যোগ্যতা নেই যে আমরা আল্লাহ কে দেখতে পারব! ২ টি ঘটনা আমাদের সকলের সামনে প্রমাণ। হযরত মুহাম্মদ ﷺ এর সাথে মেরাজের ঘটনা যেখানে আল্লাহ সাথে মহানবী ﷺ কথা বলেছেন কিন্তু আল্লাহকে দেখেন নি এবং মুসা (আ) এর তুর পাহাড়ে আল্লাহকে দেখতে যেয়ে আল্লাহর নূরে পাহাড় জ্বলে যাওয়া কিন্তু তারপরও আল্লাহকে দেখতে না পারার ঘটনা, এই দুটো ঘটনাই প্রমান যে এই দুনিয়ায় কাউকে তিনি দেখা দিবেন না কারন আল্লাহর নূর দেখার মতো সহ্যশক্তি এবং যোগ্যতা কোনোটাই মানুষের নেই। আমাদের চোখ যেখানে সূর্যের আলো পর্যন্ত সইতে পারে না সে চোখ দিয়ে আমরা কিভাবে মহান আল্লাহ তায়ালার নূর সহ্য করতে পারব? এই দুনিয়ায় কারো এত ক্ষমতা এবং যোগ্যতা নেই তাকে দেখার। “আর মূসা যখন আমাদের নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হলেন এবং তার রব তার সাথে কথা বললেন, তখন তিনি বললেন, হে আমার রব! আমাকে দর্শন দান করুন, আমি আপনাকে দেখব। তিনি বললেন, আপনি আমাকে দেখতে পাবেন না। আপনি বরং পাহাড়ের দিকেই তাকিয়ে দেখুন, সেটা যদি নিজের জায়গায় স্থির থাকে তবে আপনি আমাকে দেখতে পাবেন। যখন তার রব পাহাড়ে জ্যোতি প্রকাশ করলেন তখন তা পাহাড়কে চূর্ণবিচূর্ণ করল এবং মূসা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লেন। যখন তিনি জ্ঞান ফিরে পেলেন তখন বললেন, মহিমাময় আপনি, আমি অনুতপ্ত হয়ে আপনার কাছে তাওবাহ করছি এবং মুমিনদের মধ্যে আমিই প্রথম।” [সূরা আরাফ আয়াাত ৪৩] মহানবী ﷺ বাস্তবে কখনোই আল্লাহকে দেখেন নি, মেহরাজের রাতেও দেখেন নি বরং তিনি স্বপ্নে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন বেশ কয়েকবার। [সহীহ বুখারী ৩২৩৪; সহীহ মুসলিম (ই. ফ.) ৩৩৬; সূনান আত তিরমিজী ৩২৩৪, ৩২৩৫; মিশকাতুল মাসাবীহ ৭২৫, ৭৪৮; আহমাদ ২২১০৯; সুনান আদ-দারেমী ২১৮৮; হাদীস সম্ভার ৩৮; সহীহ হাদিসে কুদসি ১৩৬] যে হাদিসে বলা হয়েছে মহানবী আল্লাহকে দেখেছেন সেগুলা সহিহ নয়। কিন্তু ইবনে আববাস (রা) থেকে সহিহ যে বর্ণনা এসেছে আল্লাহকে দেখার, সেটার অর্থ হলো অন্তর চক্ষু দিয়ে দেখা। কপালের চক্ষু (চর্মচক্ষু) দিয়ে দেখা উদ্দেশ্য নয়। (যাদুল মাআদ, ৩/৩০) এখন অলৌকিকতা বা নিদর্শন দেখানোর কথায় আসি। আসলে যখন প্রথম ইসলাম প্রচার শুরু করা হয় তখন আল্লাহর তরফ থেকে কোন নিদর্শন আসলে কাফের-মুসরিকরা বলত যে সেগুলা যাদু, আর এখন আল্লাহর তরফ থেকে কোন নিদর্শন আসলে যেটাকে বলা হয় বিজ্ঞান। বিজ্ঞান যদি সেটার ব্যাখ্যা দিতে নাও পারে তারপরও তার ভক্তগণ যারা স্রষ্টায় বিশ্বাসী নন তারা বিভিন্ন গোজামিল দিয়ে সেটাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে আর যদি তাতেও ব্যর্থ হয় তখন বলে একদিন বিজ্ঞান এটার ব্যাখ্যা দিবেই দিবে। তাইত আল্লাহ বলেছেন, “যারা বিশ্বাস করে তারা জানে যে এটাই তাদের রবের পক্ষ থেকে একমাত্র সত্য। কিন্তু যারা অবিশ্বাস করে, তার বলে, ‘আল্লাহ আসলে এসব উদাহরণ দিয়ে কি বুঝাতে চান?’ এভাবেই আল্লাহ তায়ালা অনেককে পথ দেখান আর অনেককে পথভ্রষ্ট করেন। তিনি কেবল অবাধ্য ব্যক্তিদেরই পথভ্রষ্ট করেন। [সূরা বাকারা আয়াত ২৬] ফিজিসিস্ট পল ডেভিয়েস বিষয়টা খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন “মনে করুন 3D জগত থেকে একজন মেশিন-গানার 2D স্ক্রিনে গুলি করতে করতে ডান পাশ থেকে বাম পাশে যাচ্ছে যাতে করে প্রতিটি গুলির দ্বারা তৈরী গর্তগুলোর দূরত্ব সমান হয়। এখন 2D জগতে বসবাসকারী বিজ্ঞানী জ্যামিতির দ্বারা লিমিটেড হওয়ায় মেশিন-গানার সম্পর্কে অজ্ঞ থাকবে কিন্তু সে গর্তগুলোকে দেখতে পাবে। কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করার পর সে বুঝতে পারবে যে গর্তগুলো রেন্ডমলি সৃষ্টি হচ্ছে না বরং একটা নিয়ম (সমান দূরত্ব) মেনে সৃষ্টি হচ্ছে এবং তাতে Regularity-ও বিদ্যমান থাকছে। অতঃপর এই বিষয়টাকে সে “The Law Of Hole Creation” হিসেবে ব্যাখ্যা করবে। অথচ প্রতিটি গর্ত সৃষ্টি হচ্ছে মেশিন-গানারের কারণে। সেই চাইলে যে কোন সময়ই গর্তগুলোর দূরত্ব পরিবর্তন করতে পারে আর সেটার কনভার্শন না হলে 2D এর সাইন্টিস্টের কাছে সেটা মিরাকল বলে আর্বিভূত হবে। কনভার্শন হলে সে তার Law দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারলেও বুঝতে পারবে না যে এটা অটোমেটিক নয়।” সবচেয়ে বেশি আল্লাহর তরফ থেকে আসা অলৌকিক নিদর্শন হয়ত মূসা (আ) এর জাতি দেখেছিল কিন্তু কি হল? সেই জাতি বার বার পথভ্রষ্ট হয়েছিল। সুলাইমান (আ) এর সময় আল্লাহর তরফ থেকে আসা অলৌকিক নিদর্শনকে অনেকে যাদু বলে পাত্তাই দেয় নি। ঈসা (আ) এর সময় এত অলৌকিক নিদর্শন দেখার পরও সেই জাতির মধ্যে শুধু ১২ জন উনার উপর ইমান এনেছিল। নূহ (আ) ৯০০ বছর দাওয়াতের কাজ করেছিলেন তারপরও উনার উপর ৮/১০ জন মানুষই ইমান এনেছিল। মুহাম্মদ ﷺ এর সময়ও অনেক কাফির-মুশরিক আল্লাহর অলৌকিক নিদর্শনকে যাদু বলে অবমাননা করেছিল। আর এখনকার মানুষ অলৌকিক নিদর্শন গুলোকে বিজ্ঞানের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করার জন্য শত শত বছর নষ্ট করতেও রাজি থাকে কিন্তু তারপরও স্রষ্টার উপর ইমান আনতে চায় না। যেখানে এখন কার নাস্তিকরা আল্লাহর নিদর্শন তার সৃষ্টিকে প্রাকৃতিক জিনিস, আপনা আপনি তৈরি হওয়া সৃষ্টি ইত্যাদি বলে সেখানে তাহলে আর অলৌকিক নিদর্শন এসে লাভ কি? কারন অলৌকিক কোন নিদর্শন যদি আসেও তাহলে নাস্তিকরা সেটাকে বিজ্ঞান মাধ্যমে ব্যাখ্যা দেওয়া শুরু করবে, বিজ্ঞান যদি ব্যাখ্যা দিতে নাও পারে তারপরও নাস্তিকরা বিভিন্ন গোজামিল দিয়ে সেটাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবে, যদি তাতেও ব্যর্থ হয় তাহলে বলবে বিজ্ঞান এটার ব্যাখ্যা ভবিষ্যতে দিবেই দিবে।

Comments